ধর্ম

যাকাতের সঠিক বিতরণে দেশে এক লাখ কোটি টাকার তহবিল গঠন সম্ভব: ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

দেশের সম্পদশালী নাগরিকরা যদি নিয়মিত যাকাত প্রদান করেন, তাহলে প্রতি বছর এক লাখ কোটি টাকার বিশাল তহবিল গঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, এই অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য বিতরণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশে কোনো ভিক্ষুক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় মসজিদে আলোচনায় বক্তব্য

রবিবার (২ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় মসজিদে “রমজানের তাৎপর্য” শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইসলামিক বিধান মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

দেশপ্রেম ও নৈতিকতার গুরুত্ব

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন,
“যারা দেশের সম্পদ লুট করে বিক্রি করে দেয়, তারা দেশদ্রোহী। তারা দেশপ্রেমিক হতে পারে না। এদের কঠোর বিচারের আওতায় আনা উচিত। যদি আমরা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি এবং মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করতে পারি, তাহলে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, বরং মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও ন্যায্যতার চর্চা থাকা জরুরি।

সংযম শুধু পানাহারে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতাও প্রয়োজন

ধর্ম উপদেষ্টা বলেন,
“সংযম মানে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সংযম দেখাতে হবে। রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে জিম্মি করা সম্পূর্ণ অন্যায় ও ধর্মবিরোধী কাজ। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে ব্যবসা করা ইসলাম সমর্থন করে না।”

তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান, রমজান মাসে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রেখে ন্যায্য ব্যবসায়িক নীতি অনুসরণ করা উচিত।

ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা

ড. খালিদ হোসেন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন,
“ঘুষের লোভে কোনো ফাইল আটকে রাখা অন্যায় এবং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সম্পদ লুটপাট করা হয়, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।”

তিনি সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এবং বলেন, “আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যদি প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সততার চর্চা করে, তাহলে দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।”

যাকাতের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?

যাকাত ইসলামিক অর্থব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ধনী ব্যক্তিদের থেকে গরিবদের জন্য নির্ধারিত। ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন,
“যদি আমরা সঠিকভাবে যাকাত বিতরণ করতে পারি, তাহলে দেশে দারিদ্র্য অনেকাংশে কমে যাবে। শিক্ষার উন্নয়ন হবে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক ধনী ব্যক্তি নিয়মিত যাকাত আদায় করেন না, অথবা তাদের সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ অনুসারে যাকাত দেন না। ফলে গরিব জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যদি ধর্মীয় নীতিমালা অনুসারে ধনীরা যথাযথভাবে যাকাত প্রদান করেন, তবে এটি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

সমাজ পরিবর্তনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান

ড. খালিদ হোসেন বলেন, শুধু নামাজ-রোজা পালন করাই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাও ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন,
“যদি আমরা সত্যিকারের মুসলিম হতে চাই, তাহলে আমাদের ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, যাকাত, দান-সদকা এবং সৎ উপার্জনের মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। ইসলামের নির্দেশনা মেনে চললে সমাজ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, লোভ এবং অসততা দূর করা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

    উপসংহার

    দেশের ধনী জনগোষ্ঠী যদি নিয়মিত যাকাত প্রদান করেন এবং তা সঠিকভাবে বণ্টন করা হয়, তাহলে দারিদ্র্য দূরীকরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সংযম, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা গেলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

    ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের নৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুবিচার নিশ্চিত করতে হলে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে হলে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Back to top button