ধর্ম

সুদ-ঘুষের বিরুদ্ধে বক্তব্য, ইমামকে পেটালেন সেক্রেটারি!

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বানিয়াচং গ্রামের খন্দকার বাড়ি জামে মসজিদে এক অপ্রত্যাশিত ও নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১ মার্চ) জুমার নামাজের খুতবায় সুদ ও ঘুষের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রাখায় স্থানীয় মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ দুই শিক্ষক মিলে ইমামকে মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রতিশোধ হিসেবে হামলাকারীদের কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করেন।

ঘটনার বিবরণ

জানা গেছে, ওই মসজিদের ইমাম মো. হাসান মুরাদ খুতবায় সুদ ও ঘুষের ভয়াবহতা সম্পর্কে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “সুদ ও ঘুষ সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি শুধু অর্থনৈতিক অবক্ষয়ই ঘটায় না, বরং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের জন্যও দায়ী। একজন সৎ মানুষ কখনো ঘুষ গ্রহণ করতে পারে না এবং সুদের ব্যবসায় জড়িত থাকা ইসলামসম্মত নয়।”

এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় দুই শিক্ষক তাকে মারধর করেন। অভিযুক্তরা হলেন- বানিয়াচং গ্রামের মৃত মোহর আলীর ছেলে মো. নূরুল ইসলাম এবং জাকির হোসেন। নূরুল ইসলাম ওই মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং মহেশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। অন্যদিকে, জাকির হোসেন খোববাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

ইমামকে মারধর ও অর্থ লুটের অভিযোগ

ইমাম মো. হাসান মুরাদ বলেন, “আমি সুদ ও ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কিন্তু কিছু লোক আমার বক্তব্য সহ্য করতে পারেননি। তারা আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন মসজিদ ছেড়ে চলে যাই। আমি তাদের অনুরোধ করেছিলাম যে, রমজান মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কিন্তু তারা আমার কথায় কর্ণপাত করেননি, বরং আমাকে মারধর করে আমার কক্ষে থাকা ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন।”

তিনি আরও জানান, হামলার পরপরই স্থানীয় কিছু যুবক বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ক্ষোভে হামলাকারীদের বাড়িতে ভাঙচুর চালান। এতে বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হামলাকারীদের বক্তব্য

অভিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এলাকায় ওই ইমামকে অনেকেই ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। মুসল্লিদের অভিযোগের ভিত্তিতেই আমরা তাকে মসজিদ থেকে বিদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু শনিবার যখন আমরা তাকে বুঝিয়ে বলার জন্য গেলাম, তখন তিনি আমার চোখে আঘাত করেন। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।”

পুলিশের অবস্থান

এ ঘটনার বিষয়ে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নাজমুল হুদা বলেন, “মসজিদের ইমামকে মারধরের ঘটনার পরপরই এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে হামলা চালায়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উভয় পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন, এবং তদন্ত চলছে। দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

    সমাজে সুদ ও ঘুষের প্রভাব

    বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুদ ও ঘুষ সমাজে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা ধ্বংস করে। ইসলামের দৃষ্টিতেও সুদ ও ঘুষ মহাপাপ। সমাজের শুদ্ধিকরণ এবং সৎ পথে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এসব অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

    এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে এমন হামলার শিকার না হন। ইসলাম সুদ ও ঘুষকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে এবং যারা এগুলোর সঙ্গে জড়িত, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

    এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয় এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় আলোচনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা হয়।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Back to top button