স্বাস্থ্য

ইফতারের পর ধূমপান করলে যেসব ভয়াবহ বিপদ ঘটে শরীরে

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, তবে রোজার মাসে ইফতারের পর ধূমপান করা আরও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। যারা ধূমপানে আসক্ত, তাদের জন্য রমজান মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এই ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করার। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের পর ধূমপান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ইফতারের পর ধূমপান করলে শরীরে যেসব সমস্যা হয়

বিশেষজ্ঞরা জানান, সারাদিন রোজা রাখার পর শরীর যখন খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেয়, তখন ধূমপান করলে তা শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। সেন্টার ফর সাইকোট্রমাটোলজি অ্যান্ড রিসার্চের পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মনোসামাজিক স্বাস্থ্য গবেষক ডা. রিফাত আল মাজিদ পরামর্শ দিয়েছেন যে, রমজান মাস ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস ছাড়ার জন্য আদর্শ সময়।

১. অ্যাসিডিটির সমস্যা বেড়ে যায়

যারা ইফতারের পর ধূমপান করেন, তাদের পাকস্থলীতে অ্যাসিডিটির সমস্যা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ধূমপান পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়, যা গ্যাস্ট্রাইটিস বা পাকস্থলীতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বুক জ্বালাপোড়া, গ্যাস ও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২. হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি

সারাদিন খাবার ও পানি না খাওয়ার কারণে শরীর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইফতারের পর হঠাৎ ধূমপান করলে রক্তচাপ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, যা স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান রক্তনালী সংকুচিত করে এবং হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করে, যার ফলে কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩. ফুসফুসের প্রদাহ ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা

ধূমপান ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে সারাদিন রোজা রাখার পর যখন শরীর বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করে, তখন ধূমপান করলে ফুসফুসে বিষাক্ত উপাদান জমা হয়। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং ফুসফুসে প্রদাহ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৪. স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব

ধূমপানে থাকা নিকোটিন মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইফতারের পর ধূমপান করলে স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে, যা উদ্বেগ, অনিদ্রা, ও মনোসংযোগের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

রমজান ধূমপান ছাড়ার উপযুক্ত সময়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বিভিন্ন গবেষকরা মনে করেন, রমজান মাস ধূমপান ছাড়ার একটি চমৎকার সুযোগ হতে পারে। কারণ সারাদিন রোজা রাখার কারণে ধূমপান থেকে কিছুটা দূরে থাকা সম্ভব হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকে ধূমপানের আসক্তি চিরতরে ত্যাগ করতে পারেন।

জর্ডান ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্মোকিং সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শ্রেইম উল্লেখ করেছেন যে, ধূমপান বিশেষ করে ইফতারের পর করলে ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তাই তিনি রমজান মাসকে ধূমপান ছাড়ার উত্তম সময় হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।

ধূমপান ছাড়তে কী করা যেতে পারে?

✅ নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করুন: মনে মনে সিদ্ধান্ত নিন যে, ধূমপান ছাড়বেন এবং নিজের স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দেবেন।
✅ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: প্রয়োজনে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (NRT) বা কাউন্সেলিং নিতে পারেন।
✅ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন: ধূমপানের পরিবর্তে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, ফল ও পুষ্টিকর খাবার খান।
✅ পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা নিন: তাদের উৎসাহ ও সমর্থন ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথা

রমজান কেবল আত্মশুদ্ধির মাস নয়, এটি শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখারও একটি সুবর্ণ সুযোগ। যারা ধূমপানের অভ্যাস ছাড়তে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ সময় হতে পারে। শারীরিক সুস্থতা ও ইবাদতের পূর্ণতা নিশ্চিত করতে রোজার পবিত্রতা রক্ষা করে ধূমপান ত্যাগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ধূমপানমুক্ত সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button