মই দিয়ে উঠতে হয় ৬ কোটি টাকার সেতুতে: ভোগান্তিতে এলাকাবাসী
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার দড়িমাছিমপুর মোল্লা বাড়ি খালের ওপর ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় এটি কোনো কাজে আসছে না। একপাশে প্রায় ১৪ ফুট এবং অপর পাশে ১৮ ফুট উচ্চতার মই বেয়ে এলাকাবাসী ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন। অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন, ফলে এই সেতু এখন জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংযোগ সড়ক ছাড়াই নির্মিত সেতু
সরেজমিনে দেখা গেছে, দড়িমাছিমপুর ও কলাকান্দি গ্রামের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নির্মিত সেতুটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলেও সংযোগ সড়ক নেই। সেতুর দুই পাশে বাঁশের মই বসিয়ে মানুষ যাতায়াত করছে। পশ্চিম পাশে ১৪ ফুট এবং পূর্ব পাশে ১৮ ফুট উচ্চতায় মই দেওয়া রয়েছে, যা দিয়ে উঠতে গিয়ে অনেকে আহত হচ্ছেন। অনেক সময় বয়স্ক ও শিশুরা মই বেয়ে উঠতে না পারায় বিকল্প পথে অনেকটা ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে।
সেতুটির নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কারণ, যেখানে আশপাশে কোনো পাকা সড়কই নেই, সেখানে ৬ কোটি টাকা খরচ করে এই সেতু নির্মাণ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও স্থানীয়দের দুর্ভোগ
দড়িমাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি মই বেয়ে সেতুতে ওঠার সময় পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছি। দুই মাস বিছানায় ছিলাম, চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এই সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় এটি ব্যবহারই করতে পারছি না।”
কলাকান্দি গ্রামের ইসমাইল মিয়া বলেন, “এই সেতু হওয়ার পর আমাদের কষ্ট আরও বেড়েছে। মই দিয়ে উঠতে পারি না, তাই অন্য পথ ধরে অনেক ঘুরে আত্মীয়দের বাড়ি যেতে হয়।”
এদিকে, সাইফুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, “আমাদের গ্রামসহ আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামে কোনো পাকা সড়ক নেই। অথচ এখানে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেতু তৈরি করা হয়েছে। সংযোগ সড়ক না থাকলে এই সেতু কাদের জন্য? এটি তো সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়!”
প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও ব্যয়
তিতাস উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের সূত্র মতে, কলাকান্দি ইউনিয়নের দড়িমাছিমপুর ও কলাকান্দি গ্রামের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য দড়িমাছিমপুর মোল্লা বাড়ি খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার এবং প্রস্থ ৯ মিটার। নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
পিসি ও এমআইআইআর এবং এমএসটি নামক তিনটি প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে সেতু নির্মাণের টেন্ডার পায়। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপরও সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
কলাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম সরকার বলেন, “এই সেতু যদি প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করা না হয়, তাহলে এটি জনগণের কোনো কাজে আসবে না। সড়ক না থাকলে এটি একপ্রকার অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা হিসেবেই থেকে যাবে।”
উপজেলা প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “আমরা দ্রুত সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করতে চাই। দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য দেয়াল তৈরির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত কাজ শুরু হবে। তবে সেতু নির্মাণের পর সড়ক উন্নয়নের জন্য আলাদা বাজেটের প্রস্তাব পাঠাতে হয়। তাই আগে সেতু নির্মাণ হয়েছে, এখন সংযোগ সড়কের কাজ করাতে হবে।”
উপসংহার
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটিকে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। না হলে এই বিপুল ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো জনগণের কোনো কাজে আসবে না। সংযোগ সড়কের অভাবে এটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, যা সরকারি অর্থের অপচয় বলে মনে করছেন অনেকে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে স্থানীয়দের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।