“কোনো মানুষ নেই, পেঙ্গুইনে ভরা দ্বীপে শুল্ক বসালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প”
নতুন করে পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এতে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর ওপরই নয়, বরং একটি জনমানবশূন্য দ্বীপের ওপরও শুল্ক বসানো হয়েছে।
শুল্ক আরোপের ঘোষণা
বুধবার (২ এপ্রিল) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। তাঁর ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে এবং দেশের শিল্প খাতকে রক্ষা করতে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
নতুন এই শুল্কনীতির আওতায় ভারতের ওপর ২৭%, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০%, এবং ভিয়েতনামের ওপর ৪৬% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার।
শুল্ক তালিকায় মানুষের পরিবর্তে পেঙ্গুইন!
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার অধীনে থাকা হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ। এই দ্বীপগুলো ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এখানে কোনো মানুষের বসবাস নেই। শুধুমাত্র হাজার হাজার পেঙ্গুইন, সীল এবং বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক পাখিরা এই দ্বীপকে তাদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।
বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকায় একটি সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য দ্বীপের নাম উঠে আসায় অনেকেই হতবাক হয়েছেন।
কেন এই দ্বীপের ওপর শুল্ক?
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, দ্বীপগুলো অস্ট্রেলিয়ার অংশ হওয়ায় সেগুলোকেও শুল্ক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে একটি বিশাল পোস্টার প্রদর্শন করেন, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও অঞ্চলগুলোর নাম ছিল। এছাড়া, সাংবাদিকদের জন্য ছাপানো কাগজেও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্যমতে, হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ১০% শুল্ক আরোপ করেছে। তারা আরও দাবি করে, দ্বীপগুলোতে “অবৈধ মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা” রয়েছে, যার প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে ১০% শুল্ক আরোপ করেছে।
তবে অনেক অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, এটি একটি হাস্যকর এবং ভুল সিদ্ধান্ত, কারণ এই দ্বীপগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থনীতি নেই, নেই কোনো উৎপাদন ব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিক্রিয়া
অস্ট্রেলিয়ার সরকার এই ঘটনায় হতবাক হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তাদের সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম এবং মানববিহীন অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের তথ্যমতে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের ফ্রিম্যান্টল বন্দর থেকে জাহাজে করে এই দ্বীপে পৌঁছাতে প্রায় ১০ দিন সময় লাগে।
এই দ্বীপটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত, যেখানে মানব হস্তক্ষেপ একেবারে নেই বললেই চলে। দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে সেখানে কোনো মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি।
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, “একটি জনমানবশূন্য দ্বীপ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারে?”
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মজার মজার মিম এবং ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, “ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না যে এই দ্বীপে কোনো মানুষ থাকে না!”
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে: ইলন মাস্কের সতর্কবার্তা
সার্বিকভাবে ঘটনা কী নির্দেশ করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতির এক অদ্ভুত ভুল বা কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। কিছু অর্থনীতিবিদ বলছেন, এই সিদ্ধান্ত মূলত অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য নেওয়া হয়েছে, যদিও এটি খুবই হাস্যকরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ যখন একটি জনমানবশূন্য দ্বীপের ওপর শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলের জন্ম দেয়। এখন দেখার বিষয়, অস্ট্রেলিয়া সরকার বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলো এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায় কি না।